বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে গণমাধ্যমের প্রতিগ্ৰহণ: প্রসঙ্গ 'টেলিভিশন'

  • Suparna Mondal
  • Friday, Oct 30, 2020
blog-image

ধর্ম ও সংস্কৃতি পরস্পর সম্পৃক্ত। একটিকে অন্যটির থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে কল্পনা করা যায় না। ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতিগুলি প্রকৃতপক্ষে সাংস্কৃতিক ক্রিয়া। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ধর্ম তথা সংস্কৃতিকে এক জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ধর্ম মানুষকে যে একটা গােষ্ঠিবদ্ধতার সুরক্ষাবােধ দেয়, তার জন্য ব্যক্তিসত্তাকে ত্যাগ করেও মানুষ ধর্মের আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু বিশ্বের কাছে দ্বার বন্ধ করে কত দিন থাকা সম্ভব? এই প্রশ্নকেই তুলে ধরেছেন মােস্তাফা সরােয়ার ফারুকী তাঁর ‘টেলিভিশন’ চলচ্চিত্রটির মধ্য দিয়ে। বলা হয়, এই চলচ্চিত্রটি নাকি তুর্কি ছবি ভিজনটেলে-র দ্বারা অনুপ্রাণিত। ফারুকী অবশ্য এ কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, এই চলচ্চিত্রের কাহিনি তাঁর নিজের জীবন থেকে গৃহীত। দুটি চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও মূল বিষয় মােটামুটি এক আর তা হল টেলিভিশনের আগমন ও সমাজে তৎজনিত প্রতিক্রিয়া।

‘টেলিভিশন’ ছবির কাহিনি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের এক দ্বীপ অঞ্চলের গ্রামকে কেন্দ্র করে। মূল চরিত্র আমিন চেয়ারম্যান একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান গ্রামপ্রধান। চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যেই আমরা দেখি চেয়ারম্যানের সেক্রেটারিস্থানীয় জব্বার খবরের কাগজের ছবিগুলি সাদা কাগজ দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে। কিন্তু ঢাকবার সময়েও দেখার লােভ সামলাতে পারছে না এবং সবার অগােচরে সংবাদপত্রের নারীমূর্তিকে অবলােকন করে নিষিদ্ধ আনন্দ লাভ করছে। চলচ্চিত্রের মূল বিষয়টি এই ছােট্ট দৃশ্যটির মধ্য দিয়েই সূচীত হয়েছে। একদিকে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, অন্যদিকে প্রবৃত্তির সহজ আকর্ষণ। গণমাধ্যম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকেই কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপি তার জাল বিস্তার করেছে। কিন্তু সেই প্রবৃত্তিকে স্বীকার করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম। ধর্ম মানুষের মধ্যে অপরাধবােধ জন্ম দেয়। সেই অপরাধবােধকে হাতিয়ার করেই আমিন চেয়ারম্যান গ্রামে তার কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

কিন্তু কথায় বলে, বজ্র আঁটুনি, ফসকা গেরো। চেয়ারম্যান তার নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেন নিজের পরিবার থেকেই। এর আগে আমরা জেনেছি চেয়ারম্যানের জমজ ভাই টেলিভিশনে ওয়াজ করে বিখ্যাত হয়েছেন। তার জন্য চেয়ারম্যান লজ্জিত এবং একরকম ভাবে ত্যাগ করেছেন ভাইকে। এবার চেয়ারম্যানের ছেলে সােলেমান ভার প্রেমিকার সাথে কথা বলার জন্য একটি মােবাইল ফোন কেনার ফন্দি আঁটে। কিন্তু চেয়ারম্যানের নির্দেশ অনুসারে গ্রামে তরণ বয়সীদের মােবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। মৌখিক অনুরােধে কাজ না হলে সােলেমান ব্যবসায়িক কাজের ছুতো করে মােবাইল কেনার অনুমতি আদায় করে। তারপর দিনরাত প্রেমিকার কন্ঠস্বর শুনে মনের টেলিভিশনে তাকে কল্পনা করে। এখানেই সে থেমে থাকে না। ভিডিয়াে কলিং-এর জন্য গোপনে কম্পিউটারও কিনে ফেলে।

ঘটনা চূড়ান্ত মোড় নেয় যখন গ্রামের হিন্দু শিক্ষক কুমারবাবু হঠাৎ একদিন একটি নতুন টেলিভিশন নিয়ে গ্ৰামে আসেন। টেলিভিশনের নাম শুনে আমিন চেয়ারম্যান যেন আকাশ থেকে পড়ে। তাঁর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কেউ যে এভাবে গ্ৰামে টেলিভিশন নিয়ে চলে আসতে পারে তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। কুমারবাবু নিজের পক্ষে যুক্তি দেন, “কিন্তু আমাগো ধর্মে তো টেলিভিশন দেখলে কোন গুনা হয় না।” ধর্মপ্রাণ চেয়ারম্যান চরম দোটানার মধ্যে পড়ে যান। একদিকে টেলিভিশন এলে মুসলমানদের ইমান নষ্ট হবে, অন্যদিকে টেলিভিশন না আনতে দিলে বিধর্মীর অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। শেষ অব্দি কুমারবাবুকে এই শর্তে টেলিভিশন আনতে দেওয়া হয় যে তিনি কোন মুসলমানকে টেলিভিশন দেখাবেন না, অন্যথায় তাঁর বিচার হবে। কিন্তু অচিরেই গ্রামের সমস্ত মানুষ টেলিভিশন দেখতে ভিড় করে কুমারবাবুর বাড়িতে। স্কুলপড়ুয়া শিশুরা অন্যান্য জায়গায় টিউশন ছেড়ে কুমারবাবুর কাছেই টিউশন পড়তে ভিড় করে। সােলেমান তার প্রেমিকার জন্য টিভি দেখার বিশেষ ব্যবস্থা করে দেয় । কিন্তু এই ঘটনাও গােপন থাকে না বেশিদিন। গ্রমের অন্য টিউশন শিক্ষকেরা চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে গিয়ে টেলিভিশন কেনার নয়তো বিষ খাওয়র অনুমতি চায়। ক্রোধান্বিত চেম্বারম্যান সমস্ত ঘটনা শুনে তখনই কুমারবাবুর বাড়ি গিয়ে সােলেমানের প্রেমিকা কোহিনুরতে হাতেনাতে ধরে এবং শাস্তিস্বরূপ তাকে কান ধরে ওঠবস করায়। কুমারবাবুকে টেলিভিশনের দাম দিয়ে দেওয়া হয় এবং টেলিভিশনটি জলে ছুড়ে ফেলা হয়।

গ্রামের ছেলেরা শহরে গিয়ে টেলিভিশন দেখে এ কথা জানতে পারার পর চেয়ারম্যান শহর আসাযাওয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি শুরু করেন এবং একটি ‘ভিসা সিস্টেম’ চালু করা হয়। নৌকার টিকিট দেওয়ার আগে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু হয়। অন্যদিকে নৌকায় করে সিনেমার প্রচার করতে দেখা যায় দুজনকে, দুটি নারকেলের বিনিময়ে একটি টিকিট পাওয়া যাবে এই কথা ঘােষণা করা হয়। এই ঘােষণা শুনে চেয়ারম্যানের লােকেরা ঢিল মেরে তাদের তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তারপরেও সিনেমা হাউসফুল হয়। সেখানে গিয়ে সিনেমা দেখেছিল এমন কিছু যুবকদের বেঁধে আনা হয় চেয়ারম্যানের কাছে। তিনি নিজের জনহিতৈষী ভাবমূর্তি দিয়ে তাদের বােঝানোর চেষ্ট করেন। কিন্তু এভাবে যে বেঁধে রাখা সম্ভব হবে না তা জব্বার বুঝতে পারে এবং চেয়ারম্যানকে বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করতে বলে। চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে জব্বার একটি ‘হালাল টেলিভিশন’ নির্মাণ করে। বস্তুত টেলিভিশনের আকারে একটি মঞ্চ নির্মাণ করা হয় এবং সেখানে নাটক অভিনীত হয়। কিন্তু নাটকেও যেহেতু অভিনেতাকে মিথ্যা করে একটি চরিত্রের ভূমিকা নিতে হয় তাই ইসলামের নীতি অনুযায়ী তা হারাম। অতঃপর চেয়ারম্যান এই ‘হালাল টেলিভিশন’-এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেন।

চেয়ারম্যান হজে যাওয়া স্থির করলে পাসগাের্টের জন্য একটি ছবি তোলার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু এই হারাম কাজ করতে তিনি প্রথমত রাজি হন না। আর কোন উপয় নেই জেনে নিন মনােকষ্টে ভোগেন, আহারনিদ্রা ত্যাগ করেন। শেষে নিরুপায় হয়ে গােপনে ছবি তুলে নেন। তাঁর এই ছোট পদক্ষেপেই এক বিরাট পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়।

চেয়ারম্যানের অনুভূতিতে আবারও আঘাত লাগে যখন তাঁর পুত্র সােলেমান প্রেমিকার কথামতাে তাদের বিবাহের কথা এবং নতুন টেলিভিশন কেনার কথা মাইকে করে প্রচার করে বেড়ায়। চেয়ারম্যান ও তার সঙ্গীরা তাদের বাধা দিতে এলে হাতাহাতির উপক্রম হয়। এতে চেয়রম্যান অত্যন্ত মর্মাহত হন। পরে সোলেমান নিজের ভুল বুঝতে পেরে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। চেয়ারম্যান হজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ঢাকা শহরে এসে দেখে সংবাদপত্রের যে সব ছবি এতদিন তিনি ঢেকে রাখতেন, শহর জুড়ে বড়াে বড়াে হাের্ডিং-এ সেইসব ছবি। এরপর হজ অফিসে এসে দেখেন তাঁর মতো আরও অনেক হজযাত্রীকে প্রতারণা করা হয়েছে। মনের দুঃখে চেয়ারম্যান সাহেব একটি হোটেলে ঘর নিয়ে ওঠেন। সেখানে দুইদিন অনাহারে থাকার পর হঠাৎ পাশের ঘরে টেলিভিশন থেকে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনি শুনতে পান।

নিজের ঘরের টিভিটি চালিয়ে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। মানসলোকে যেন মক্কার পুণ্যতীর্থে পৌঁছে যান তিনি। এইভাবে আমরা দেখি, কীভাবে আপাদমস্তক টেলিভিশনবিরোধী একটি মানুষও টেলিভিশনকে স্বীকার করতে বাধ্য হন। ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিশ্বায়ণের আন্তঃসম্পর্কের জন্য জায়গাটি এখানে আমাদের লক্ষ করতে হবে। ড্যানিয়েল কার্বি ও ক্যারোল এম. কিউস্যাক তাঁদের “Religion and Media: An Introduction” নামক প্রবন্ধে বলেন,

The dominance of technology began with the Industrial Revolution of the late eighteenth and early nineteenth century, and artists and European artists and intellectuals were quick to identify the modern urban environment as a site of immorality, and the advent of mechanization as the destroyer of the organic community of faith, kinship, and land.

‘টেলিভিশন’ চলচ্চিত্রের আমিন চেয়ারম্যান চরিত্রটির ক্ষেত্রেও এ কথা প্রয়ােজ। আধুনিক যান্ত্রিক প্রযুক্তির সঙ্গে ইসলামের নীতিগত বিরোধ যেমন ছিল তেমনি প্রযুক্তি সম্পর্কে চেয়ারম্যানের সংশয় তাঁকে এগুলির উপর বিধিনিষেধ আরােপ করতে প্রণােদিত করেছিল। ফেসবুক-সহ এই সমস্ত আধুনিক প্রযুক্তি তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অধঃপতনের কারণ, এই ছিল তাঁর বিশ্বাস।

আবার, প্ৰথা বা ট্র্যাডিশনের সঙ্গে গণমাধ্যমের আন্তঃসম্পর্কের জায়গাটিতে এলে বিভিন্ন তাত্ত্বিকের বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। মার্ক্স এবং ওয়েবার দুজনেই বলেছিলেন প্রথা বা ট্র্যাডিশন আধুনিকতার সঙ্গে মিলতে পারে না। অন্যদিকে বিশ্বায়ণ বিশ্বব্যাপি স্বাধীনতার ধারণা প্রচার করে ধর্মীয় স্বাধীনতাকেও স্থান করে দিয়েছিল। ফলে ধর্ম, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের আন্তঃসম্পর্ক বুঝতে হলে বিশ্বায়ণকেও নতুন করে বুঝতে হবে। ‘টেলিভিশন’ চলচ্চিত্রে প্রথম দিকে আমরা যা দেখি তাতে মনে হয় প্রথার সঙ্গে আধুনিকতার মিলন যেন সম্ভব নয়। কিন্তু পরিশেষে প্রথাকে ধীরে ধীরে সমঝােতায় আসতে হয় আধুনিকতার সাথে। তার কারণ কিন্তু সেই বিশ্বাস । সমগ্র বিশ্ব আজ একটাই বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ সেখানে রুখে রাখা সম্ভব নয় আর। আমিন চেয়ারম্যানের মতো গোঁড়া মুসলমানকেও শেষ পর্যন্ত নিজের ছবি তোলাতে হয়। সেটা কিছুটা নিরুপায় হয়ে হলেও পরিশেষে টেলিভিশনের পর্দায় মক্কার বহুআকাঙ্খিত তীর্থস্থান দর্শন করার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনেও টেলিভিশনের অনুপ্রবেশ ঘটে যায়। অবশ্যই এই চলচ্চিটি বাংলাদেশে টেলিভিশনের প্রতিগ্ৰহণের একমাত্র চিত্র নয়। অনেক বাঙালি মুসলমানই টেলিভিশনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিলেন। এরা হলেন সেই শ্রেণি যাঁরা শীতকালে গ্রামে যাত্রা করাতেন। আবার যাঁরা যাত্রা না করিয়ে ওয়াজ করাতেন, তাঁরাই হয়তো এই টেলিভিশনকে সদর্থক ভাবে নিতে পারেননি। তবে গণমাধ্যমের রাজনীতিটাই এমন যে তা গণমাধ্যমবিরোধী স্বরকেও তার অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে। মনে পড়ে ফেসবুকে একটি পেজে একটি শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম সেখানে মডেল মেয়েটি হিজাব পরা অবস্থাতেই মাথায় শ্যাম্পু দিচ্ছে! খুবই হাস্যাস্পদ হয়েছিল বিজ্ঞাপনটি নেটিজেনদের কাছে। তবে এমন বিজ্ঞাপন নির্মাণের কারণটিও ভেবে দেখার। বিশেষত মুসলিম ধর্মপ্রাণ দর্শকদের জন্য সমস্ত কিছুকে ‘হালাল’ রূপে পরিবেশিত করার মধ্যে বাজার অর্থনীতির প্রভাব তো অনস্বীকার্য। কাজেই টেলিভিশন হারাম হওয়া সত্ত্বেও টেলিভিশনে ওয়াজ করা হালাল। কারণ পণ্য সংস্কৃতির যুগে বাজারই শেষ কথা বলবে। হালাল-হারাম-এর হিসাব ঠিক করে দেবে বাজারই।

Suparna is a co-founder of the CC1919 group and currently works as an independent researcher and translator