হোমেন বরগোহাঞিকে যেমন দেখেছি

  • Basudev Das
  • Friday, Jun 4, 2021
blog-image

সময়টা বোধহয় ১৯৮৩ বা ১৯৮৪ সন হবে।দীৰ্ঘ দিন অসম আন্দোলনের ফলে স্কুল কলেজ বন্ধ থাকার পর আবার শিক্ষানুষ্ঠানগুলিতে নতুন করে পড়াশোনা শুরু হয়েছে ।গণেশ গুড়ির কাছে হেংরা বাড়ির সরকারি আবাসনে গুয়াহাটি কমার্স কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপিকা ভারতী চক্রবর্তী থাকতেন। আমার সেখানে নিয়মিত যাওয়া আসা ছিল। একদিন পিসির কাছে (ভারতী চক্রবর্তী)শুনলাম পিসিদের ঠিক উপরের ফ্ল্যাটে হোমেন বরগোহাঞি থাকেন।

শৈশব এবং কলেজ জীবনে বাংলা সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ পাঠক হলেও অসমের জল হাওয়ায় লালিত-পালিত হওয়া সত্ত্বেও অসমিয়া সাহিত্যের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। কিছুদিন ধরে বরগোহাঞির বইপত্র পড়ে আমি অসমিয়া সাহিত্যের একজন অনুরাগী পাঠক হয়ে উঠছিলাম । বরগোহাঞির বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং গল্প উপন্যাস আমার মনে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেই সময় কবি নন্দলাল সেনগুপ্তের সম্পাদনায় গুয়াহাটি থেকে ‘পৃথিবী’ নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন বের হত। আমি ওই পত্রিকাটিতে ‘হোমেন বরগোহাঞির সাহিত্য’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখি। আমার মনের মধ্যে বরগোহাঞিকে দেখার একটি ভীষণ আকাঙ্ক্ষা জন্মেছিল । তাই সেদিন পিসির মুখে যখন জানতে পারলাম যে হোমেন বরগোহাঞি উপরের ফ্ল্যাটেই থাকেন তখন আমি বরগোহাঞির সঙ্গে দেখা করার জন্য ছটফট করতে লাগলাম। পিসি আমাকে বরগোহাঞির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবেন বলে কথা দিলেন । ইতিমধ্যে আমি বরগোহাঞির বেশিরভাগ গল্প-উপন্যাসই পড়ে ফেলেছি। তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল বরগোহাঞির প্রবন্ধ। আমার সামনে এক নতুন আলোর জগত খুলে গেল । আমি যেন সব পেয়েছির দেশে পৌঁছে গেলাম। প্রজ্ঞার সাধনা, জীবন সাধনা, আমার প্রিয় মানুষ সক্রেটিস, ঈশ্বর ইত্যাদি প্রবন্ধ আমার জীবনের গতিপথ বদলে দিল। যে আমি অসমিয়া সাহিত্য থেকে সহস্ত্র যোজন দূরে ছিলাম,সেই আমার কাছে অসমিয়া সাহিত্য হয়ে উঠল প্রতিদিনের ধ্যানজ্ঞান। বরগোহাঞি আমার চোখ খুলে দিলেন। যে মানুষটা খুব সহজেই বলতে পারেন-‘বইয়ের সঙ্গে আমি কথা বলি, বইয়ের সঙ্গে আমি ঝগড়া করি’- তাকে ভালো না বেসে কি থাকা যায়? যায় না। নিজের অজান্তেই তাই বরগোহাঞিকে ভালোবেসে ফেললাম। কিন্তু তখনও বরগোহাঞির সঙ্গে দেখা হয়নি।শবরীর অন্তহীন প্রতীক্ষা তখনও চলছে।

একদিন সন্ধ্যা বেলা ভারতী পিসির কাছে বসে গল্প করছি। হঠাৎ কী একটা প্রয়োজনে যেন বরগোহাঞি পিসির কাছে এসেছেন। বরগোহাঞি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই আমাকে ডেকে নিয়ে পিসি পরিচয় করিয়ে দিলেন। ব‍্যস আর যায় কোথায়, আমি প্রায় বরগোহাঞির পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। কোনো মতে পায়ে হাত দিয়ে প্রণামটা সেরে নিয়েছি, যেন দেরী করলেই বিরাট কিছু একটা মিস করে ফেলব। বরগোহাঞি স্মিত হেসে শুধু একটা কথাই বললেন- ‘এইজন্যই আমি বলি বাঙালিরা খুব আবেগপ্রবণ হয়।’ এরপর বরগোহাঞির সঙ্গে কম করেও ১৪/১৫ বার দেখা হয়েছে। যখনই কলকাতা থেকে গুয়াহাটি গিয়েছি তখনই কিছুক্ষণের জন্য হলেও বর গোহাঞির পত্রিকার অফিসে দেখা করতে গিয়েছি। তিনি সমস্ত নিয়ম ভেঙ্গে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও আমাকে ভেতরে ডেকে নিয়েছেন। আজ সেসব কথা মনে হলে চোখে জল ভরে আসে। বার তিনেক বরগোহাঞির হেংরাবাড়ির কোয়ার্টারেও গেছি। একবারের কথা মনে আছে। তখন কটন কলেজের শতবর্ষ উদযাপন চলছে। বরগোহাঞিকে নিয়ে যাবার জন্য নিচে কলেজের গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেই অবস্থায় আমি দেখা করতে গিয়েছি। আমার জানা ছিল না যে সেদিন বরগোহাঞির এরকম একটি জরুরী মিটিং রয়েছে। আমাকে ভেতরে ডেকে নিলেন, কিছুক্ষণ এটা ওটা নিয়ে কথা বললেন। আমি বললাম আমার একটি অসমিয়া অভিধানের প্রয়োজন, কার অভিধান নিলে ভালো হবে একটু যদি বলে দেন,আমি কিনে নেব।আমার কথা শুনে বরগোহাঞি হঠাৎ ভেতরের ঘরে চলে গেলেন, ফিরে এলেন হাতে একটি বই নিয়ে। আমাকে বললেন,- ‘আপাতত আমার ব্যবহৃত এই অভিধানটি নিয়ে যাও ,পরে কখন ও কিনে নিও ।’ আমি স্যারকে বইটিতে নাম লিখে দিতে বললাম, তারপর মহা সমাদরে বইটি হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। আজও বরগোহাঞি স্যারের সেই অভিধানটা আমার হাতের কাছেই রয়েছে,নেই কেবল বরগোহাঞি স্যার।

এরপরেও যখনই বরগোহাঞি স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছে স‍্যারের লেখা কোনো না কোনো বই আমাকে উপহার দিয়েছেন। এভাবেই বরগোহাঞির অনেক বই আমার সংগ্রহে এসেছে। প্রথম দিকে উনার দুটি খন্ডে প্রকাশিত রচনাবলী অবশ্য কিনে নিয়ে ছিলাম।শুধু বরগোহাঞি স্যারের নিজের লেখা বই নয় অসম প্রকাশন পরিষদ থেকে প্রকাশিত অসমিয়া ছোটগল্পের তিনটি সংকলন গ্রন্থও বরগোহাঞি স্যার টেলিফোন করে দেবার পরে আমি পরিষদ থেকে সংগ্রহ করে নিয়েছিলাম । আমি অসমিয়া ছোটগল্পের অনুবাদ করতে চাই জানতে পেরে তিনি এই সুযোগটা করে দিয়েছিলেন। ততদিনে আমি স্বেচ্ছায় বদলি নিয়ে কলকাতায় চলে এসেছি।প্রথমেই অনুবাদ পত্রিকায় বরগোহাঞির ‘শিল্প’ নামের গল্পটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়।অরবিন্দ আশ্রমের মুখপত্র ‘শৃন্বন্তু’ পত্রিকায় হোমেন বরগোহাঞির প্রবন্ধ গুলি নিয়মিতভাবে অনুবাদ করতে শুরু করি। পত্রিকার সম্পাদক সুপ্রিয় ভট্টাচার্য আমাকে এই বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। বেশ কয়েক বছর ‘শৃন্বন্তু’ পত্রিকায় আমি বরগোহাঞি অনুবাদ করেছি। পরবর্তীকালে অনূদিত প্রবন্ধগুলি একত্রিত করে ‘অফবিট’ পাবলিকেশন হাউস থেকে ' জীবন সাধনা’ নাম দিয়ে বই প্রকাশিত হয়েছে। বইটি পাঠক মহলে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তারপর একে একে আমার অনুবাদে উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির থেকে হোমেন বরগোহাঞির উপন্যাস ‘মৎস্য গন্ধা’,প্রতিভাস থেকে ‘সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়,সেতু প্রকাশনা থেকে বরগোহাঞির সতেরোটি প্রবন্ধের সংকলন ‘বইয়ের সঙ্গে কথাবার্তা’ বেরিয়েছে। এই বইটি বাংলার মননশীল পাঠকরা সাদরে গ্রহণ করেছেন। বইটির জনপ্রিয়তা আমাকে কয়েক মাস আগে বইয়ের হাট থেকে একটি ই-বুক সংস্করণে অনুপ্রাণিত করে।বলাবাহুল্য মাত্র এই ই-বুক করার ক্ষেত্রে বন্ধু ডক্টর রাজেন্দ্রনাথ দেবনাথ আমাকে পূর্ণ সহযোগিতা করেন। মূলত তাঁর চেষ্টাতেই ই-বুকটি প্রকাশিত হয়। এই সুযোগে আমি ‘বইয়ের হাট’ এর কর্ণধার রিটন খানকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

মহাশ্বেতা দেবী সম্পাদিত ‘বর্তিকা’ পত্রিকায় বরগোহাঞির উপন্যাস ‘মৎস্য গন্ধা বেরিয়েছিল।ধারাবাহিক ভাবে নয়,একটি সংখ্যাতেই গোটা উপন্যাসটা বেরিয়েছিল।পরবর্তীকালে বরগোহাঞির ‘আমার হৃদয় একটি যুদ্ধক্ষেত্র’ নামে আত্মজীবনীমূলক রচনাটির দুটো সংখ্যা বর্তিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মহাশ্বেতাদি অসুস্থ হয়ে পড়ায় ‘বর্তিকা’ বন্ধ হয়ে যায় এবং ধারাবাহিকটির প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। তবে আশার কথা এই যে খুব শীঘ্রই প্রতিভাস থেকে বইটি প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০০৫ সনে হোমেন বরগোহাঞির সম্পাদনায় একটি অত্যন্ত উচ্চ মানের সাহিত্য পত্রিকা ‘সাতসরী’ প্রকাশিত হয়। আমাকে অবাক করে দিয়ে বরগোহাঞি আমার অনুবাদ চর্চা নিয়ে ‘সাতসরী'র জন্য একটি প্রবন্ধ চেয়ে পাঠান।এটা ছিল আমার কাছে আশাতীত রূপে সৌভাগ্য। প্রবন্ধটি ‘মোর অসমীয়া সাহিত্যচর্চা’ নাম নিয়ে ২০০৫ সনে ১৫-৩১ আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। বরগোহাঞি যতদিন ‘সাতসরী'র সঙ্গে জড়িত ছিলেন ততদিন আমাকে ম্যাগাজিন পাঠিয়ে গেছেন।

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে ‘বই’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের হত।অফিস ছুটির পরে প্রায়ই সন্ধ্যার দিকে রবীন্দ্র সদন চত্বরে চলে যেতাম।পাশেই বাংলা আকাদেমি।একদিন ভয়ে ভয়ে ঢুকে গেলাম। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহ উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্র সরকার তখন বাংলা আকাদেমির উপ সভাপতি।অসমিয়া সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে ভীষণ আগ্রহী।মাঝে মাঝেই অসমের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সভা সমিতিতে বক্তৃতা দিতে যান। ভয়ে ভয়ে স্যারের রুমে ঢুকে যাই এবং জানাই যে ‘বই’ পত্রিকায় অসমিয়া সাহিত্যিক হোমেন বরগোহাঞি সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখতে চাই। স্যার বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে লেখাটা জমা দিতে বলেন। লেখাটা যথারীতি ছাপা হয়।আমার জানামতে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির এই পত্রিকায় এটিই প্রথম অসমিয়া সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ।

আমি তখন সল্টলেকের স্টাফ কোয়ার্টারে থাকি।হঠাৎ একদিন আমার মাস্টার মশাই বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিতের কাছ থেকে টেলিফোন পাই।স্যার জানান যে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে হোমেন বরগোহাঞিকে সম্মানিত করা হবে।পরিষদ বরগোহাঞির সাহিত্য কীর্তি সম্পর্কে অধ্যাপক রক্ষিতের কাছে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন।স্যার জানতেন আমি সেইসময় শৃ্ন্বন্তু পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বরগোহাঞির প্রবন্ধের অনুবাদ করছি। তাই তিনি আমাকে অনুরোধ করেন বরগোহাঞি সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে দিতে।আমি সানন্দে রাজি হয়ে যাই।তবে শারীরিক অসুস্থতা হেতু বরগোহাঞি সেবার আসতে পারেন নি।নির্দিষ্ট দিনে ছুটি নিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলাম। তবে অনুষ্ঠান হয়ে যাবার পরে মানপত্র এবং মেডেলটা পাঠাতে পরিষদ যেভাবে টালবাহনা করে মাসের পরে মাস সময় নষ্ট করেছিল তাতে তিনি খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন।কিন্তু কথাটা তিনি কাউকে বলেন নি। তাঁর ভদ্রতা বোধ তাকে মুখ খুলতে বাধা দিয়েছিল।আমাকে গোটা ব্যাপারটা চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন।কিন্তু চিঠির কোথাও কোনো অভিযোগ ছিল না।

‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদক তখন কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত।একদিন সাহস করে অমিতাভ বাবুর সঙ্গে দেখা করতে অফিস ছুটির পরে পত্রিকার অফিসে চলে গেলাম।অনেক চেষ্টায় সাহস করে বলে ফেললাম আমি অসমিয়া সাহিত্য থেকে বাংলায় গল্প অনুবাদ করে থাকি।শুনেই অমিতাভ বাবু বললেন-‘অনুবাদ করবে,ঠিক আছে ।হোমেন বরগোহাঞির একটা গল্প এই সংখ্যার জন্য দিয়ে যেও।’আমি যেন হাতে চাঁদ পেয়েছি। বরগোহাঞির এপিটাফ’গল্পটা অনুবাদ করে জমা দিয়ে এলাম। যথাসময়ে সেই গল্প প্রকাশিত হল।

কত স্মৃতি,কত ঘটনা। আমার জীবনে এত ভালোবাসা এবং সম্মান আর কোথাও পাইনি। এ যেন কবির ভাষায় ‘আমার জীবন পাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছ দান’।বরগোহাঞির প্রবন্ধের বই ‘সারাংশ’আমাকে উৎসর্গ করেন।মনে পড়ে হঠাৎ একদিন ফোন এসেছিল।বললেন-‘বাসুদেব, আমার ‘সারাংশ’ বইটি তোমাকে উৎসর্গ করতে চাই। তোমার কোনো আপত্তি আছে কি?’আমি তখন উত্তেজনায় থর থর করে কাঁপছি। কোনোভাবে বললাম ‘এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কিছু হতে পারে না।’ততক্ষণে লাইন কেটে গেছে।

বরগোহাঞি আজ নেই। গুয়াহাটি গেলে এবার কার সঙ্গে দেখা করতে যাব?কাকে ফোন করে পৌছানোর সংবাদ জানাব? আমার প্রাণের মানুষটা যে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন। তবে এখন থেকে বরগোহাঞিকে বাইরের জগতে না খুঁজে তাঁর লেখার মধ্যে খুঁজে বেড়াব। সেখান থেকে ‘আমার বরগোহাঞি’কে তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। এমনকি মহাকাল ও নয়।

-———-

Basudev Das is a veteran scholar, writer and has more than 400 translations published under his name.